“রানার ছুটেছে তাই ঝুম্‌ঝুম্ ঘন্টা বাজছে রাতে
রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,
রানার চলেছে, রানার!
রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার।
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-
কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।”

সুকান্ত ভট্টাচার্যের রানার কবিতাটি আজকালের বাচ্চাদের বুঝিয়ে দিতে হয়! তারা কল্পনাই করতে পারে না মানুষ এক সময় চিঠির জন্য এতটা কষ্ট করেছে! অবাক হচ্ছেন? আমিও অবাক হয়েছি। খুব কি বেশী দিন আগের কথা? না, মাত্র ১০০ বছর হবে হয়ত। বাচ্চাদের কাছে বিলিয়ন/মিলিয়ন বছর আগের ডাইনোসর এর ইতিহাস বাস্তব মনে হবে কিন্তু “রানার” কবিতার বাস্তবতা তাদের কাছে কাল্পনিক লাগে।

এই জন্য অবশ্য তাদের দোষ দেয়া চলে না। কারন খুব দ্রুত পাল্টে গেছে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা। বেশী দূরে যাই না, চিঠি দিয়েই শুরু করি। এই তো ৩৫ থেকে ৪০ বছর আগেও মানুষ একটা চিঠির জন্য ৩/৪ দিন বা এক সপ্তাহ অপেক্ষা করত। বিদেশ থেকে চিঠি আসতে অনেক সময় এক মাসও লেগে যেত। তারপর শুরু হল “পত্র মিতালী” । বিভিন্ন পত্রিকার বা সাপ্তাহিক বা মাসিক ম্যাগাজিনের মাধ্যমে একজন আরেকজনের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা। এরপর আরেকটু দ্রুত করার জন্য চলে আসল টেলিফোন। মফসল গুলোতে তখনও চিঠি বা টেলিগ্রাম চলছে। ধীরে ধীরে সেখানেও পৌছে গেল টেলিফোন।

এরপর হুট করে চলে আসল মোবাইল। আর যায় কোথায়! অতি দ্রুত তা হাতে হাতে পৌছে গেল। মানুষ তখন ইন্টারনেট সম্পর্কে হালকা ধারনা পোষণ করছে। কিন্তু মোবাইল কোম্পানি গুলো ঠিক সেই সময় চালু করে দিল মোবাইলে ইন্টারনেট সার্ভিস। বিভিন্ন প্যাকেজ, স্বল্প দাম, মুহুর্তে বিশ্ব কে এনে দিল হাতের মুঠোয়। ভুলে গেল মানুষ চিঠি লেখা। কারন ই-মেইলের যুগে চিঠি লিখবে কোন বেকুব??
তারপর আসল বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম, যার মাধ্যমে সবাই সবার হাড়ির খবর থেকে শুরু করে মনের খবর পর্যন্ত পেতে থাকল মুহুর্তের মাধ্যমেই। জীবনে চলার গতি বেড়ে গেল দ্রত থেকে দ্রুততর ভাবে। এর পরের কাহিনী সবারই জানা। হ্যাঁ আমাদের বর্তমান চলনাম অবস্থা।

যে শিশুটি জন্ম থেকে নয়, মায়ের পেটে থাকা কালীন অবস্থা থেকে দেখে আসছে কত দ্রুত চলছে পৃথিবী, তার কাছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের রানার কবিতাটি কল্পকাহিনী মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। সে চিনে না পোস্ট অফিস কি, কি কি কাজ এই অফিসের, যে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে কত কত চিঠির মাঝে আদান-প্রদান হয়েছে তার বাবা-মা’র ভালবাসা, কষ্টের কথা।

পৃথিবী প্রতি নিয়ত বদলে যাচ্ছে। আসুন আমরা পরিবর্তনের স্রোতে ভেসে যাবার সাথে সাথে আজকের শিশুটিকে অতীত সম্পর্কে সঠিক ধারনা দেই, যতটুকু আমরা ভালভাবে জানি তাই। এটা সবারই মনে রাখা উচিত, উৎস সম্পর্কে ভাল ধারনা না থাকলে ভালভাবে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া যায় না।